মিরাজ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রিয় নবীর জন্য শ্রেষ্ঠতম একটি মুজিযা। যা অন্যান্য রাসূল গণ পাননি। অনেক নবী রসুল আল্লাহকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করেছেন। কেউ বা আল্লাহর নিদর্শন দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উজায়ের আ:, ইবরাহীম আ:, মুসা আ:।
ইবরাহীম আ: এর পুনরুত্থান দেখার ইচ্ছা করেন:
সূরা বাকারা : ২৬০
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِن قَالَ بَلَى وَلَكِن لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةٌ مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
আর যখন ইব্রাহীম বলল, ‘হে আমার রব! কিভাবে আপনি মৃত কে জীবিত করেন দেখান’, তিনি বললেন, ‘তবে কি আপনি ঈমান আনেন নি?’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই হ্যাঁ, কিন্তু আমার মন যাতে প্রশান্ত হয় [১] ! আল্লাহ্ বললেন, ‘তবে চারটি পাখি নিন এবং তাদেরকে আপনার বশীভুত করুন। তারপর সেগুলোর টুকরো অংশ এক এক পাহাড়ে স্থাপন করুন। তারপর সেগুলোকে ডাকুন, সেগুলো আপনার নিকট দৌড়ে আসবে। আর জেনে রাখুন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রমশালী , প্রজ্ঞাময় [২]।
মেরাজের সময়কাল :
মিরাজ হয়েছিল নবুওয়াতের ১০ তম বছরে, তখন নবীজি (সা.)-এর বয়স ৫০ বছর।
মিরাজের স্থান:
১। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ফরমাইয়াছেন : আমি হাতীমের মধ্যে শায়িত ছিলাম। -বুখারী
২। আর একটি হাদীসে রহিয়াছে, “তিনি শিয়াবে আবি তালিবে ।ছিলেন।” -ওয়াকিদী
৩। অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, প্রিয় নবী উম্মে হানীর গৃহে ছিলেন। -তিবরানী
৪। আরো একটি হাদীসে পাওয়া যায়, হুজুর নিজ গৃহে ছিলেন, সেই সময় তাঁহার গৃহের ছাদ ফাঁক হইয়া গিয়াছিল। -বুখারী
ব্যাখ্যা – [ক] উপরোল্লিখিত হাদীসগুলির সামঞ্জস্য এইরূপে হইবে যে, উম্মে হানীর ঘর “শিয়াবে আবি তালিবের’ নিকটে ছিল। হুজুর (সঃ) সেই ঘরে রাত্রি যাপন করিতেছিলেন, নিজের বিশ্রামাগার হিসাবে উহাকেই আপন ঘর বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। সেখান হইতে তাঁহাকে হাতীমে আনা হইয়াছিল, ঘুমের ঝুঁকি তখনও যায় নাই, তাই হাতীমে আসিয়া আবার একটু শুইয়া পড়িলেন।
ঘরের ছাদ দিয়ে প্রবেশের কারণ:
সূরা হুজুরাত:4
اِنَّ الَّذِیۡنَ یُنَادُوۡنَکَ مِنۡ وَّرَآءِ الۡحُجُرٰتِ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ ﴿۴﴾
নিশ্চয় যারা তোমাকে হুজরাসমূহের পিছন থেকে ডাকাডাকি করে তাদের অধিকাংশই বুঝে না।
মেরাজের কারণ :
নবীজি (সা.)-এর চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন। এই বছরকে নবী (সা.)-এর জীবনে ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখের বছর বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুঃখ নিবারণ ও তাঁকে উদ্বুদ্ধকরণার্থে মিরাজ সংঘটিত হয়।
মেরাজ এর সত্যতা প্রমাণ:
মিরাজের বিবরণ কোরআন করিমে সুরা নাজমে ও সুরা ইসরায় বিবৃত হয়েছে। বুখারি, মুসলিম, সিহাহ সিত্তাহসহ অন্যান্য কিতাবে এই ইসরা ও মিরাজের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য বিশুদ্ধ সূত্রে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
সূরা বনী ইসাঈল:১
سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِہٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَہٗ لِنُرِیَہٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّہٗ ہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ
পবিত্র মহিমাময় তিনি [১], যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করালেন [২], আল-মসজিদুল হারাম [৩], আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত [৪], যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি [৫], তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা
عِنۡدَ سِدۡرَۃِ الۡمُنۡتَهٰیসূরা নাজম আয়াত 14 ঃ
মিরাজের প্রস্তুতি:
জিবরাইল ও মিকাইল (আ.) রাসুল (সা.)-কে জমজমের পাশে নিয়ে বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং ‘কলব’ (অন্তরাত্মা) বের করে জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে ইলম ও হিকমতে পরিপূর্ণ স্বর্ণের পাত্রে রেখে আবার বক্ষে স্থাপন করেন। এরপর তার দুই কাঁধের মাঝে নবুয়তের সিলমোহর স্থাপন করেন। এরপর তারা বুরাক নামক বাহনে করে নবী (সা.)-কে মসজিদে আকসা পর্যন্ত নিয়ে যান।
(বুখারি, হাদিস নং: ৩৮৮৭, মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৭)
. ثُمَّ دَخَلْتُ بَيْتَ الْمَقْدِسِ فَجُمِعَ لِيَ الْأَنْبِيَاءُ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ , فَقَدَّمَنِي جِبْرِيلُ حَتَّى أَمَمْتُهُمْ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا , فَإِذَا فِيهَا آدَمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ الثَّانِيَةِ , فَإِذَا فِيهَا ابْنَا الْخَالَةِ عِيسَى وَيَحْيَى عَلَيْهِمَا السَّلَامُ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ الثَّالِثَةِ فَإِذَا فِيهَا يُوسُفُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ الرَّابِعَةِ , فَإِذَا فِيهَا هَارُونُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ الْخَامِسَةِ فَإِذَا فِيهَا إِدْرِيسُ عَلَيْهِ السَّلَامُ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ السَّادِسَةِ فَإِذَا فِيهَا مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ، ثُمَّ صُعِدَ بِي إِلَى السَّمَاءِ السَّابِعَةِ , فَإِذَا فِيهَا إِبْرَاهِيمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ. ثُمَّ صُعِدَ بِي فَوْقَ سَبْعِ سَمَاوَاتٍ فَأَتَيْنَا سِدْرَةَ الْمُنْتَهَى، فَغَشِيَتْنِي ضبَابُةٌ , فَخَرَرْتُ سَاجِدًا , “
—
[حكم الألباني] منكر
সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৪৫০
হাদিসের মান: মুনকার
ফুটনোটঃ
[১] ‘সিদরাহ’ শব্দের অর্থ কূল বৃক্ষ এবং ‘মুনতাহা’ শব্দের অর্থ শেষসীমা। পৃথিবী হতে উর্ধ্বলোকে নীত হয় তা ওখানে গিয়েই থেমে পড়ে, অতঃপর তার অপর পাড়ে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা সেখান হতে তা গ্রহণ করে উপরে নিয়ে যান। শেষ সীমায় চিহ্নস্বরূপ ঐ স্থানটাতে একটা কূল বৃক্ষ থাকায় ঐ সীমান্ত চিহ্নকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ বলা হয়।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৮৮৭
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ” أُرِيتُ النَّارَ فَإِذَا أَكْثَرُ أَهْلِهَا النِّسَاءُ يَكْفُرْنَ ”. قِيلَ أَيَكْفُرْنَ بِاللَّهِ قَالَ ” يَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ، وَيَكْفُرْنَ الإِحْسَانَ، لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَى إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ ثُمَّ رَأَتْ مِنْكَ شَيْئًا قَالَتْ مَا رَأَيْتُ مِنْكَ خَيْرًا قَطُّ
ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেনঃ ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষণো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’
(৪৩১,৭৪৮,১০৫২,৩২০২,৫১৯৭; মুসলিম ৮/১ হাঃ ৮৮৪, আহমাদ ৩০৬৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৮,ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৮)
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৯
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
প্রতি আকাশে যে সমস্ত নবীদের সাথে দেখাঃ
প্রিয় নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে মিরাজের সফরে বিভিন্ন নবী-রাসুলের সাক্ষাৎ হয়।
- প্রথম আসমানে হজরত আদম (আ.),
- দ্বিতীয় আসমানে হজরত ইয়াহইয়া (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.),
- তৃতীয় আসমানে হজরত ইউসুফ (আ.),
- চতুর্থ আসমানে হজরত ইদরিস (আ.),
- পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.),
- ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.),
- সপ্তম আসমানে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়।
তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে সালাম ও কুশল বিনিময় হয়। এরপর তিনি বায়তুল মামুরে গেলেন, এটি ফেরেশতাদের কিবলা; যেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা আসেন ও প্রস্থান করেন, যাঁরা দ্বিতীয়বার আসার সুযোগ পান না। (বুখারি: ৩৬৭৪, প্রথম খণ্ড)।
মিরাজ রজনীতে প্রিয় হাবিবের একান্ত সাক্ষাতে এসব সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়:
- আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করা যাবে না,
- পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে,
- নিকট আত্মীয়স্বজনের অধিকার দিতে হবে;
- মিসকিনদের ও পথসন্তানদের অধিকার দিতে হবে;
- অপচয় করা যাবে না, অপচয়কারী শয়তানের ভাই,
- কার্পণ্য বা কৃপণতা করা যাবে না,
- সন্তান হত্যা করা যাবে না,
- ব্যভিচারের কাছেও যাওয়া যাবে না,
- মানবহত্যা করা যাবে না,
- এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না,
- প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতে হবে, মাপে পূর্ণ দিতে হবে,
- অজ্ঞতার সঙ্গে কোনো কিছু করা যাবে না,
- পৃথিবীতে গর্বের সঙ্গে চলা যাবে না।
এ সবই মন্দ, তোমার রবের কাছে অপছন্দ।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২২-৪৪)।








